
ইকুয়েডরের সবচেয়ে জনবহুল শহর
গুয়াইয়াকিলে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে মানুষজন শুধুমাত্র জনাকীর্ণ
হাসপাতাল মারা যাচ্ছে তা নয়, এখানে মানুষকে রাস্তায় মরে পড়ে থাকতে দেখা
গেছে।
কোভিড-১৯ এর কারণে বাড়িতে যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের
মরদেহগুলো সরিয়ে নিতেও কয়েকদিন সময় লেগে যাচ্ছে। কারণ মরদেহ সরিয়ে
নেয়ার তালিকা আর এর জন্য অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।গুয়াইয়াস প্রদেশে করোনাভাইরাসের কারণে পহেলা এপ্রিল পর্যন্ত ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুরো ল্যাটিন অ্যামেরিকার সবগুলো দেশ মিলিয়ওে এই পরিমাণ মানুষ মারা যায়নি করোনাভাইরাসে। ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে ১৯৩৭ জনের মধ্যে।
অন্যদিকে ইকুয়েডরে দোশরা এপ্রিল পর্যন্ত ১৭৫৮ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ৯৮জনের।
প্রদেশটির রাজধানী গুয়াইয়াকিলেই মোট আক্রান্তের ৭০% রোগীর বসবাস।
এটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শহরগুলির মধ্যে একটি যেখানে মাথাপিছু করোনাভাইরাস আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি।
তার উপর, ভাইরাস পরীক্ষার আগেই যারা মারা গেছেন তাদেরকে এই পরিসংখ্যানের বাইরে রাখা হয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ইকুয়েডরে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা তৃতীয় সর্বোচ্চ - এর আগে রয়েছে ব্রাজিল এবং চিলি- তবে জনসংখ্যার অনুপাতে ইকুয়েডরে মৃত্যুর হার অন্যান্য দেশের চাইতে বেশি।
গুয়াইয়াকিলের শেষকৃত্য আয়োজকরাও এই পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারছে না।
সঙ্কটের মাত্রা এমন যে প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনো মৃতদেহ সরিয়ে নিতে এবং সমাহিত করতে বিশেষ টাস্কফোর্স তৈরি করেছেন।
"আমার মামা সেগুন্দো ২৮শে মার্চ মারা গিয়েছিলেন এবং কেউই আমাদের সাহায্য করতে আসেনি।" বলেন, জেসিকা কাস্তেদা।
তিনি রাজধানী থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দক্ষিণে ২৫ লাখ জনবসতির কুইটো শহরে বাস করেন।
"হাসপাতালে বিছানা পাওয়া যায়নি এবং তিনি বাড়িতেই মারা যান। আমরা জরুরি সেবা সংস্থাগুলোয় খবর দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের বলেছে ধৈর্য্য ধরতে। তার মরদেহ এখনও বিছানায় পড়ে আছে, আমরা ছুঁয়েও দেখতে পারিনি।"

"আমার প্রতিবেশী পড়ে গিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন, এবং আমি (জরুরি নম্বর) ৯১১ এ ফোন করেছিলাম, কিন্তু তারা আসেনি," শহরের বাসিন্দা ওয়েন্ডি নোবোয়া বলেন।
তার ৯৬ বছর বয়সী প্রতিবেশী গোর্কি পাজমিনো ২৯শে মার্চ দুর্ঘটনার কারণে মারা যান।
"তার মরদেহটি পুরো দিন মেঝেতে পড়ে ছিল। পরিবার এসে না তোলা পর্যন্ত তিনি ওভাবেই পড়ে ছিলেন। তবে তারা তাকে কবর দিতে পারেনি। কারণ তার মৃত্যুর সনদ স্বাক্ষর করার মতো কোনও ডাক্তার ছিলেন না।"
যারা রাস্তায় পড়ে মারা যাচ্ছেন তাদের মৃত্যুর খবর রিপোর্ট করতে এবং মানুষকে সেটা জানাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছেন স্থানীয়রা।
গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে যে একজন ব্যক্তি একটি হাসপাতালের বাইরে পড়ে আছেন এবং একটি বাড়ি থেকে লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করা হচ্ছে(যদিও বিবিসি স্বাধীনভাবে ফুটেজের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি)।

"এখানে আমরা রাস্তায় মানুষকে ঘুমোতে দেখতে অভ্যস্ত। এখন আমরা দেখছি গৃহহীন মানুষেরা শহরের কেন্দ্রে মারা যাচ্ছেন।"
যারা বাড়ির ভেতরে মারা যাচ্ছে তাদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এবং তারা সরকারী সুযোগ-সুবিধার উপর যথেষ্ট চাপ দিতে পারছে।
জনাকীর্ণ হাসপাতালগুলো আর কোন রোগীকে জায়গা দিতে পারছে না।
"গুয়াইয়াকিলের মানুষেরা হতাশ, কাউকে কাউকে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে", এক্সপ্রেসো পত্রিকার সাংবাদিক ব্লাঙ্কা মনকাদা এ কথা বলেন।

নিউজ এজেন্সি ইএফই-র একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপেক্ষমান তালিকায় বর্তমানে ১১৫টি নাম রয়েছে।
প্রতিদিন বেলা ২টার পর থেকে দেশব্যাপী ১৫ ঘণ্টার কারফিউ জারির কারণে কফিন সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গোছানোও শেষ করা যায় না।
সেনাবাহিনী কমান্ডার ডারউইন জারিন মাত্র কয়েকদিন আগে গুয়াইয়াস প্রদেশের সরকারি সামরিক ও পুলিশ সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বিবিসিকে জানান যে, এই সপ্তাহের শেষে সমস্ত মরদেহ সমাহিত করা হবে।
"দাফনের সার্বিক দায়িত্ব সশস্ত্র বাহিনী পালন করবে।" তিনি বলেন।
তবুও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকায় বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
স্থানীয় গণমাধ্যম এই বিষয়টি তুলে ধরায় দেশটিতে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গুয়াইয়াকিলের মেয়র সিনটিয়া ভিটেরি (করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় যিনি এখন আলাদা হয়ে আছেন), জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতার জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন।
"তারা মৃতদেহগুলোকে রাস্তার পাশে ফেলে রাখছে, লোকেরা হাসপাতালের সামনে মরে পড়ে আছে। কেউ লাশ নিয়ে যেতে চাইছে না। আমাদের অসুস্থ মানুষদের তাহলে কী হবে? বিপর্যস্ত পরিবারগুলোকে সারা শহরের সরকারি হাসপাতালগুলোর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও কোন খালি বিছানা নেই। কোন হাসপাতাল এই অসুস্থ মানুষদের জায়গা দিতে পারছে না" বলেন মেয়র।

গণকবর বিতর্ক
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ইকুয়েডরেই প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। সেটাও ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে।এরপর দেশটি জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার ঘোষণা দেয়।
দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী জুয়ান কার্লোস জেভালোস বিবিসিকে বলেন, "বিশ্বে যা চলছে আমরা তা অস্বীকার করতে পারি না, বিষয়টি গুরুতর।"
"তবে আমাদের এটা বোঝাতে হবে যে এই মহাদেশে আমরাই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছি।"
তবে মি. জেভালোস, সরকারের বিরুদ্ধে অনেক সমালোচনাকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
গুয়াইয়াস প্রদেশের পৌর সরকার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়, গণকবরে মানুষকে সমাহিত করার প্রস্তাব দিলেও দ্রুত সেটা থেকে পিছিয়ে আসেন।
"এটি একটি ভয়ানক ধারণা," গুয়াইয়াকিলভিত্তিক সমাজবিজ্ঞানী হেক্টর চিরিবোগা বিবিসি নিউজ মুন্ডোকে বলেন।
"এটি এমন একটি শহর যেখানে কোনও আত্মীয় ইউরোপ থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত পরিবারগুলো তাদের শেষকৃত্য বন্ধ রাখে। কারণ ইকুয়েডরের বিপুল সংখ্যক মানুষ বিগত দুই দশকে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে।"
এই সমাজতাত্ত্বিক বলেছেন, রক্ষণশীল গুয়াইয়াকিলে গণকবর দেওয়ার প্রস্তাবে অনেকেই বিচলিত হয়েছেন।
"এটি ধার্মিক পরিবারগুলির জন্য একটি বড় আঘাত। এখানকার ক্যাথলিকদের শেষকৃত্য পরিচালনা করতে বাধা দেওয়ায় তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।"
জর্জে ওয়াটেড হলেন বাড়িঘর এবং হাসপাতালগুলো থেকে মরদেহ সংগ্রহের জন্য প্রেসিডেন্ট মোরেনোর পরিচালিত টাস্কফোর্সের প্রধান।
তিনি বলেন, গণকবরের পরিকল্পনা যদি এগিয়ে যেত তবে তাকে এই দায়িত্ব দেয়া হতো না।
"তবে পরিবারগুলি এখনও শেষকৃত্য অংশ নিতে পারবে না।" তিনি বলেন।

ভয়ে ভয়ে বাঁচা
ইকুয়েডরের বিভিন্ন সমস্যার একটি হল কিছু শেষকৃত্য আয়োজক প্রতিষ্ঠান, সেবা দেয়া থেকে বিরত থাকছে।কারণ তারা মৃতদেহ থেকে করোনভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
"এখানে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষজন মনে করছে যে গুয়াইয়াকিলে সবাই কোভিড -১৯-এ মারা যাচ্ছে।" ইকুয়েডরের পাবলিক হেলথ সোসাইটির ডাক্তার গ্রেস নাভারেট বলেন।
নাভারেট জানিয়েছেন যে মৃতের স্বজনরাও ভয়ে ভয়ে আছেন।
"একই বাড়িতে, কেউ মারা যাচ্ছে কিন্তু বাকিরা তাদের শরীর স্পর্শ করছে না এবং গুয়াইয়াকিলের আবহাওয়া অনেক গরম, তাই দেহগুলি দ্রুত পচে যেতে শুরু করে।"
এক্ষেত্রে আরও বড় পরিসরে পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজন বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আর্নেস্তো টরেস মনে করেন যে এই মহামারি কমিউনিটি স্তরে মোকাবেলা করা উচিত।
"আমরা যদি সম্প্রদায়ের লোকদেরকে যুক্ত করি তবে আমরা হাসপাতালের উপচে পড়া ভিড় প্রতিরোধ করতে পারতাম।" টরেস বলেন।
সংকট মোকাবেলায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে স্যানিটারি ব্রিগেড তৈরি করা যেতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন।
ইকুয়েডরের মানবাধিকার স্থায়ী কমিটির (সিএইচএইচ) সদস্য পল মুরিলো বলেছেন, এই অঞ্চলের কয়েকটি ছোট এবং প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীতে অনেক গভীর মানবিক সংকট রয়েছে"।
"এই রোগ প্রতিরোধের জন্য বাড়ির ভেতরে থাকা খুব প্রয়োজনীয় একটি ব্যবস্থা, তবে আমরা শহরের সেই দুস্থ মানুষগুলোর জন্য নূন্যতম খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা ভাবি নি।" মুরিলো বলেন।
গুয়াইয়াকিলের ১৭% এরও বেশি জনগোষ্ঠী দরিদ্রতার মধ্যে বাস করে।
গুয়াইয়াস অঞ্চলে এই সামাজিক বৈষম্য বেশ প্রকট।

"আমি বাকি লাতিন আমেরিকার দিকে তাকালে দেখতে পাই, তারা এখন যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটা আমরা তিন সপ্তাহ আগেই নিয়েছিলাম।" সরকারের টাস্কফোর্স নেতা জর্জে ওটেড বলেছেন।
"ইতিমধ্যে, আমরা এই অপ্রতিরোধ্য পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি এবং যতটা সম্ভব দ্রুততার সাথে কাজ করছি"।
0 Comments